» ওলো সই আমার ইচ্ছা করে তোদের মতন মনের কথা কই 

প্রকাশিত: 19. August. 2024 | Monday

ওলো সই আমার ইচ্ছা করে তোদের মতন মনের কথা কই 

গাজী আব্দুল কাদির মুকুল

 

নিউজ ডেস্ক :

আগস্ট মাস বাংলাদেশী জনগণের জন্য জাতীয় বিপ্লব, সুখ-শান্তি, খুশি, আনন্দ ও উল্লাসের মাস, কেননা এই মাসে দেশের জনগণ দুইবার ভারতের দালাল দুই স্বৈরশাসকের ফ্যাসিস্ট শাসনামল থেকে মুক্তি পেয়ে, অতি মূল্যবান মহান স্বাধীনতা, এর গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করেছে এবং জাতিকে হীনমন্য, ভারতের কাছে পরনির্ভর করার অপপ্রয়াস রুখে দিয়েছে।

আমি ১৯৪৭ দেখিনি, ভাষা আন্দোলনের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করতে পারিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশুকাল থাকায় সেই সময়ের স্মৃতিগুলো আমার কাছে একেবারেই ফাঁকা।

তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর তাৎপর্য এবং সঠিক ইতিহাস বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। কৈশোরে যখন পা রেখেছি, তখন ১৫ই আগস্টের পরিবর্তনের কিছু স্মৃতি এখনও আমার মনে গেঁথে আছে।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমার মতো লক্ষ কোটি মানুষ এই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে আছেন।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এবং ৫ই আগস্ট ২০২৪ সাল:

 শেখ মুজিবুর রহমানের অভিশপ্ত ও সর্বনাশা নেতৃত্ব থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সংযোজিত করে।

গোটা দেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং নতুন করে পথযাত্রা শুরু হয়। জন্ম হয় এক নতুন বাংলাদেশের । উন্মোচিত হয় বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত ।

শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তার জনপ্রিয়তা শূন্যের নিচে নেমে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পরেও জনগণ চরম উল্লাস প্রকাশ করে। চরম জনবিচ্ছিন্ন মুজিব নিহত হওয়ার পর ঢাকার দোকানের সমস্ত মিষ্টি শেষ হয়ে গিয়েছিল, কারণ মুজিবের কুশাসনের আমলে দেশের জনগণ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ছিল। তার সরকারের তথাকথিত রক্ষী বাহিনীর দ্বারা দেশের সর্বত্র ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, মারপিট, লুট, বলাৎকার, ছিনতাই, জবরদখল ইত্যাদি গুরুতর অপরাধ সর্বদা সংঘটিত হচ্ছিল। ক্ষমতার লোভে শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে সকল রাজনৈতিক দল বাতিল ঘোষণা করে একদলীয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করেন। এই বাকশালী ব্যক্তিশাসনের কলঙ্কময় অধ্যায় থেকে অসহায় দেশবাসীকে মুক্ত করার মহান উদ্দেশ্যে বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীর কিছু মুক্তিযোদ্ধা সদস্য একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাই, একটি মহান এবং সফল সামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব নিহত হন। বলা যায়, মুজিব নিজের আদর্শহীনতা, গোঁয়ার্তুমি এবং অযোগ্যতার জট পাকানো রশিতে গলা আটকে নিজেই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। নদীর পানি প্রবাহিত হবার স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দিলে পানি স্ফীত হয়ে এক সময় নিজের পথ অবশ্যই করে নেয়। রাজনৈতিক ময়দানেও মতপ্রকাশের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করলে অস্বাভাবিক পন্থায় তা প্রকাশ পাবেই। শেখ মুজিব বাকশাল কায়েম করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন এর কোন রাজনৈতিক প্রতিকারের পথ থাকলে সেনাবাহিনীর কোন ভূমিকা পালনের প্রয়োজন হতো না। যাইহোক, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ ও অমানিশার অবসান ঘটে বাংলা মায়ের কয়েকজন সূর্যসন্তানের দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায়। মুজিবী জালেমশাহীর মৃত্যুঘণ্টা বাজে এবং উদয় হয় অরুণরাঙা প্রভাত। অকুতোভয় এই দামাল সন্তানেরা যেন বাংলাদেশের মুক্তিপাগল বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতিনিধি। সেদিন যেমন আপামর বাঙালি জনতা তাদের কৃতজ্ঞতাভরে হৃদয় নিংড়ানো স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছিল, তেমনই স্বাধীনচেতা বাঙালিরা চিরকাল এই তরুণদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাবে। বস্তুত, জাতীয় নেতৃত্বের অবিমৃষ্যকারিতা ও বিজাতীয় দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার সূর্য সম্ভাবনা হিসাবেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট চিরকাল পরিগণিত হবে।

আজাদী-পাগল বাঙালির জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ১৫ আগস্ট সত্যিই এক অনন্য দিবস। এটি ছিল কার্যত দিল্লি ও দিল্লির দাসদের অশুভ শৃঙ্খল মোচনের প্রথম পদক্ষেপ এবং শুভ সূচনা। বলাবাহুল্য, কিছু মহল ১৫ আগস্টকে জাতীয় নাজাত দিবস হিসেবে অবহিত করতেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ১৯৭২-এর শুরুতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুজি এমন নৃশংসভাবে সপরিবারে নিহত হওয়া সত্ত্বেও এর প্রতিবাদে দেশের কোথাও ২০/২৫ জনের একটি মিছিলও বের হলো না। তার দলের নেতৃবৃন্দ, এমপিরা, বাকশালের স্বেচ্ছাসেবকরা, এমনকি শেখ মুজিব সরকারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীবাহিনীও এত বড় ঘটনার বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিক্রিয়াও দেখালো না। এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর কী হতে পারে? শেখ মুজিবের মৃতদেহ দীর্ঘ সময় সিঁড়িতেই পড়ে রইল। ঢাকায় জানাজার ব্যবস্থাও কেউ করল না। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে হেলিকপ্টারে লাশ নিয়ে শেখ মুজিবের গ্রামের বাড়িতে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। গোপালগঞ্জে তাকে জানাজা পড়ানোর জন্য কেউ খুঁজে পাওয়া গেল না। অবশ্য সেখানে অল্প কিছু লোককে ডেকে দায়সারাভাবে জানাজা পড়ানো হয়। মুজিব হত্যার মতো এত বড় ঘটনায় মনে হয়, সারা দেশের জনগণ খুশি হলেও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তা না হলে, হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনেই এলাকার লোকজন দলে দলে সমবেত হওয়ার কথা ছিল। বর্তমান প্রজন্ম এইসব ইতিহাসের কিছুই জানে না। আগস্ট-বিপ্লবের পর দেশের রাজনীতি আবার স্বাধীন ও জাতীয় চেতনায় ফিরে এলো। দেশের এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে, চীন, সৌদি আরবসহ আরও অনেক দেশ তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শাসনতন্ত্রের মৌল ভিত্তির আসন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রকে বিদায় করা হলো এবং তার জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হলো ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’। আর শাসনতন্ত্রের শুরু করা হলো আল্লাহর নাম নিয়ে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বলে। রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার উপর যে বিধি-নিষেধ শাসনতন্ত্রে ছিলো, তার বিলোপ সাধন করা হলো। এছাড়া শাসনতন্ত্রে একদলীয় শাসনব্যবস্থার যে বিধান ছিলো, তাও উচ্ছেদ সাধন হয়ে গেলো। এই শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ফলে জাতি অসহনীয় ও অশরীরী এক বন্দিদশার হাত থেকে মুক্তি পেলো, অনুভব করলো স্বাধীনতার স্বাদ।

৫ই আগস্ট ২০২৪: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে

আধুনিক কালে কোনো স্বৈরশাসকই গণঅভ্যুত্থানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে মসনদ রক্ষা করতে পারেনি। কুখ্যাত রক্তপিপাসু শেখ হাসিনা বহু নিন্দিত স্বৈরাচারী ছিলেন এবং আত্ম মহিমায় এতই মগ্ন ছিলেন যে কখন ছাত্র-জনতার রুদ্ররোষে পাথরের মতো ভেসে গেছেন, তা নিজেও বুঝতে পারেননি। পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষার অনুকম্পা পেলেও তার স্বৈরতন্ত্রের অনিবার্য পরিণতি নিয়ে এসেছে হত্যা, বিভেদ এবং বিচ্ছিন্নতার বিপর্যয়। এ কারণে তাকে নিষ্ঠুরভাবে ভুগতে হবে ইতিহাসের নির্মম পরিণতি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনকালে স্বৈরাচারের সর্বপ্রকার উপাদান দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল—চাই অর্থনীতি, চাই রাজনীতি, চাই সমাজ-সংস্কৃতি—সর্বত্রই হাসিনার আগ্রাসী স্বৈরতন্ত্র জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো। বিশ্বের বহু স্বৈরাচারীর অসংখ্য কীর্তি বিবর্ণ হয়ে গেছে হাসিনার তুলনায়। সরকার প্রধান হয়ে হাসিনা দেশটাকে তার পৈতৃক লাখেরাজ সম্পত্তির মতো বানিয়ে ফেলেছিলেন এবং দেশটাকে গড়ে তুলেছিলেন অবর্ণনীয় কষ্টের কারাগারে। হাসিনার অগনতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের অনিবার্য ফল ভোগ করতে হয়েছে সমগ্র দেশবাসীকে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে ৫ই আগস্ট, হাসিনার স্বৈরতন্ত্র এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করল। হাসিনা তার পিতার মতোই স্বৈরশাসন চালু করেছিলেন। উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের ছাত্ররা এবং আপামর জনতা যদি এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিজয় না আনতেন, তাহলে দুর্বৃত্ত হাসিনার কুশাসন দেশের উপর কতকাল চেপে থাকতো তা আল্লাহই জানেন। যাই হোক, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টে বাংলাদেশের সব দিগন্তে এক নতুন সূর্য উঠেছে। এই সূর্যের প্রতিটি আলোকবিন্দুতে আমরা রেনেসাঁর দ্যুতি দেখতে পাচ্ছি। নিজের দেশের বাস্তবতায় সেই দেশের জনগণ মুক্তির পথ খুঁজে নেবে। বাংলাদেশ এক নবজাগরণ জাতির নব উদ্বোধনের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সফল বিপ্লব গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পরিবর্তনের সূচনা। দুঃখজনকভাবে ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনে অসংখ্য সম্ভাবনাময় নবীন প্রাণ ঝরে গেছে নিষ্ঠুর গণহত্যাকারী হাসিনা স্বৈরাচারের নির্বিচার সশস্ত্র আক্রমণে। নিহত হয়েছে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ। দুগ্ধপোষ্য শিশুও রেহাই পায়নি ফ্যাসিবাদের হত্যা উৎসব থেকে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। চিরতরে পঙ্গুত্বের শঙ্কায় শত শত আহত মানুষ। নিহত ও আহতদের প্রতি রইলো আমার গভীর সমবেদনা। বিশেষ করে, স্বৈরতন্ত্রের সব ধরনের ভয়, ভীতি, রক্তচক্ষু, রক্তপিপাসা ও গুলি উপেক্ষা করে আত্মবলিদানে উদ্বুদ্ধ ছাত্রনেতৃবৃন্দকে আমি অভিবাদন জানাই। তাদের বিজয় আজ জাতির অমর বিজয়কাব্য। বর্তমান সময়ে আমাদের দাবি হলো-দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সাম্প্রতিক হত্যা, লুটপাটসহ সব অপরাধের তদন্ত ও বিচার করতে হবে। কেননা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহির অনুপস্থিতি দেশটাকে সর্বদিক থেকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার, সম্পূর্ণরূপে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে গিয়েছে। সুতরাং, সরকারকে এ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। গত ১৫ বছরের সীমাহীন দুর্নীতিই আজ বাংলাদেশকে নিঃস্ব করে দিয়ে ‘আওয়ামী জাহিলিয়াত’ বানিয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্রহীনতার অবাধ ও উলঙ্গ চর্চার প্রতিফলন ঘটেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সুস্থ বিকাশ না ঘটলে এই গণবিপ্লবের সাফল্য অর্জিত হবে না। শিক্ষাব্যবস্থা বলতে বাংলাদেশে আজ কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিগত ফ্যাসিস্টরা শিক্ষা নামক বিষয়টিকে হত্যা করেছে। সুতরাং, এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি একটি সর্বজনীন গণমুখী শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাজাকার ইস্যু: আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল উজ্জীবনী শক্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামক প্রতারণার অস্ত্র। তারা দেশের জনগণকে সবসময় এই বিশ্বাসে আস্থাশীল করতে চেয়েছে যে, তারাই একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে তারা সর্বদা রাজনৈতিক বাণিজ্য করে মুনাফা অর্জনের অপপ্রয়াস চালায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধ্বজাধারী হয়ে নিজেদের দলের বাইরের প্রতিটি নাগরিককে তারা রাজাকার হিসেবে চিত্রিত করেছে। বিরোধী মতের সকলকে আখ্যা দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের ধ্বজাধারী হিসেবে। আসলে কে একুশ শতকের আসল রাজাকার, কে আসলে দেশবিরোধী শক্তি এবং ভয়ানক দিল্লির এক ফ্যাসিস্ট এজেন্ট ও রাজাকার, তা গত ১৫ বছরে দিনের আলোর মতো দেশের আপামর জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সুতরাং, বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ তাদের দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা ‘স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি’ এবং ‘রাজাকার’ নামক স্লোগান হারিয়ে ফেলেছে। হাসিনা তার নিজের এবং আওয়ামী লীগের ভিন্নমত পোষণকারীকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। স্মরণ করা প্রয়োজন যে, এই ‘রাজাকার, রাজাকার’ বলে যে শোরগোল তারা তোলে, সেই ‘রাজাকার’ ধ্বনির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে তাদের এক সুক্ষ্ম চালাকি ও দুরভিসন্ধি। হাসিনা ও তার অনুসারীরা ভারতের প্রকৃত রাজাকার ও দালাল, সেটা যেন বাংলার জনগণ বুঝতে না পারে এবং তা থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্যই তাদের এই নগ্ন কৌশল।
উন্নয়নের ধাপ্পাবাজি: যুগে যুগে পৃথিবীর সকল স্বৈরশাসক উন্নয়নের ধোঁকা দিয়েই জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করেছে। বস্তুত, সকল স্বৈরাচারী সরকার কিছু কিছু দৃশ্যমান উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করে তাদের মসনদ চিরস্থায়ী করার জন্য। বাংলাদেশের স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারও কিছু উন্নয়নমূলক কাজকে সামনে রেখে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে তারা বাংলাদেশের উন্নয়নমুখী সরকার। প্রকৃত অর্থে, বিগত ১৫ বছরে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের যে জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, গণতন্ত্রহীনতা, ভোটাধিকার হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন-গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, চুরি, ডাকাতি, ন্যায়বিচারের অভাব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে নিয়েছিল, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। বিষয়টি ছোট্ট একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়: যেমন, একজন ব্যক্তির কিডনি ফেলিয়ার, হৃদপিণ্ডের রোগ, ফুসফুস, লিভার পচে গেছে, পেটের মধ্যে মারাত্মক টিউমার বিদ্যমান, এবং যেকোনো সময় ব্যক্তিটি মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারে। অথচ সেই ব্যক্তির বাহ্যিক অবয়ব, সুন্দর মুখ, এবং স্বাস্থ্য দেখে যে কেউ বলবে তিনি খুবই ভালো আছেন। ঠিক সেভাবেই শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধোঁকাবাজি চলছে। অথচ যে কোনো সময় দেশ দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০ বছর, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত, আমাদের বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হয়নি, পাকিস্তান আমলের মাত্র ২৩ বছরে আকাশচুম্বী উন্নয়ন হয়েছিল। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানভুক্ত এলাকায় মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি ঢাকায় এবং তা ছিল অতি ছোট আকারের। ছিল না কোনো সামুদ্রিক বন্দর, কোনো মেডিকেল কলেজ, কৃষি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ক্যান্টনমেন্ট। পাকিস্তান আমলের মাত্র ২০ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৭টি বিশাল আকারের বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ একাত্তরের পর, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ বছরের ইতিহাসে সে মাপের বিশাল কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যা হয়েছে তা অতি ছোট মাপের; খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল ও সিলেটে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তারই উদাহরণ। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানের বিশাল আকারের ৭টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠিত হয় বড় বড় ক্যাডেট কলেজ ও জেলা স্কুল । এছাড়াও অনেকগুলি ক্যান্টনমেন্ট। নির্মিত হয়েছে দুটি সামুদ্রিক বন্দর। ১৯৪৭ সালের আগে ঢাকা শহরে বড় আকারের কোনো বিল্ডিং ছিল না, ছিল না কোনো আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, এমনকি এক হাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারে এমন কোনো মসজিদও ছিল না। জাতীয় সংসদ, কমলাপুর রেল স্টেশন, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, শাহবাগ হোটেল (এখন পিজি হাসপাতাল), শেরাটন হোটেল, হাইকোর্ট বিল্ডিং, ডিআইটি ভবনসহ শহরের বড় বড় এমারতগুলো পাকিস্তান আমলেই গড়ে উঠেছিল। প্রশ্ন হলো, এত উন্নয়নের পরেও আমরা কেন পাকিস্তান থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলাম? এর একটাই উত্তর—পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, বৈষম্য ও স্বৈরশাসন। এই সকল অবিচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। পরিশেষে বলা যায়, এরশাদ আমলে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি বানানোর অনেক বাগাড়ম্বর করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের উন্নয়নেরও অনেক ঢাকঢোল পেটানো হয়েছিল। একই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনাও ‘উন্নয়নের সরকার’ নামে অনেক উৎসবের আয়োজন অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু এসব উন্নয়নের ধোঁকাবাজি আর কাজে লাগেনি।
আওয়ামী লীগ কি পুরাতন দল? : অনেকেই মনে করেন যে বর্তমান আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরাতন রাজনৈতিক সংগঠন, কিন্তু এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা এবং এর চরিত্র সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মূলত, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এটি আওয়ামী লীগ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং এই দলটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল প্রতিষ্ঠা করার সময়, আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার পর থেকেই দলটি কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। ফলে, প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম থেমে যায়। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সর্বজনীন এবং প্রশংসনীয় একটি সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে, স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দলটি একটি ভিন্ন, দুর্বৃত্তপূর্ণ চরিত্র ধারণ করে। বিশেষ করে, একাত্তরের পর থেকে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনামলে, দলটি সাধারণ মানুষের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার পর, ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল নতুনভাবে আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বর্তমান আওয়ামী লীগ দাবি করে যে তারা শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ হৃদয়ে লালন করে রাজনীতি করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি মুজিব আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন, তাহলে তারা কেন আওয়ামী লীগ নামেই দল গঠন করে রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে? এতে এই ধারণা করা অমূলক হবে না যে বর্তমান আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে গেছে। যাইহোক, বর্তমান আওয়ামী লীগকে ১৯৭৫ সালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। যারা বলেন যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সেই ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগেরই উত্তরসূরি, তাদের এই দাবি যুক্তিহীন এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

[hupso]