News Head

» সিলেটের রত্ন কে এম আবুতাহের চৌধুরী

প্রকাশিত: 12. October. 2026 | Monday

কে এম আবু তাহের চৌধুরী বৃটিশ বাংলাদেশী মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় – রাজা আহমদ ফয়সাল চৌধুরী

সিলেটের রত্ন কে এম আবুতাহের চৌধুরী – এম এ হোসেইন

 

নিউজ ডেস্ক লন্ডন :

মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জনে নয়, বরং অন্যের জীবনে রেখে যাওয়া অবদান ও ভালোবাসায়। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, নিঃসঙ্গতা আর শেকড়ের টানে যখন মানুষ স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে, তখন কিছু মানুষ হয়ে ওঠেন তার আশ্রয়, ভরসা ও আপনজন। জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে স্বদেশের মমতা ছড়িয়ে দেন চারপাশে। কে এম আবু তাহের চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ—বৃটেনে বাঙালি কমিউনিটির পরিচিত মুখ, সমাজকর্মী এবং দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তিত্ব।

লন্ডনে আসার পর থেকেই তাঁকে সাংবাদিকতার জগতে দেখেছি। সংবাদপত্রের পাতায় মানুষের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ক্রমে মানুষের জীবনের আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। কারণ, প্রতিটি সংবাদের পেছনে থাকে একজন মানুষ, তার সংগ্রাম, বেদনা কিংবা বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। তাহের ভাই সেই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছেছেন, তাঁদের কথা শুনেছেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড আমাকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বড় পরিচয় সে কতটা অর্জন করেছে, তা নয়; বরং বিপদের দিনে কতজনের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটাই তার প্রকৃত পরিচয়।

বৃহত্তর সিলেটের প্রতি তাহের ভাইয়ের ভালোবাসা তাঁর সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গ্রেটার সিলেট ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলকে ঘিরে তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতা, বৃটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠনটির শাখা বিস্তারের উদ্যোগ, সিলেট বিভাগের দাবিতে আন্দোলন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন এবং প্রবাসীদের হয়রানির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান—সবকিছুর মধ্যেই জন্মভূমির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যায়।

মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে পারে, কিন্তু দেশের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক কখনো সহজে মুছে যায় না। দূরদেশে থেকেও নিজের অঞ্চলের মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকার নিয়ে কাজ করার মধ্যে যে আন্তরিকতা রয়েছে, তাহের ভাইয়ের কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন দেখা যায়।

একই সঙ্গে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর সক্রিয়তা প্রশংসার দাবি রাখে। যে সমাজে গায়ের রং, ভাষা কিংবা জন্মপরিচয়ের কারণে মানুষকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, সেখানে সমান অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী সমাজের নানা সমস্যা মোকাবিলা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাঁকে কমিউনিটির কাছে পরিচিত করে তুলেছে।

বয়সের 65 এর কোঠায় এসেও তাঁর কর্মচাঞ্চল্য আমাকে বিস্মিত করে। অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়ার যে মানসিকতা তিনি ধারণ করেন, তা নতুন প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও অভিজ্ঞতা যখন মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে, তখন ব্যক্তিগত জীবনও বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য লাভ করে।

পূর্ব লন্ডনের ভ্যালেন্স রোডের বাড়িটির কথা মনে হলে আমার কাছে সেটি শুধু একটি আবাসিক ঠিকানা বলে মনে হয় না; বরং মানুষের কথা শোনার ও প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর একটি পরিচিত আশ্রয় হিসেবে ভেসে ওঠে। কেউ আসেন পরামর্শের জন্য, কেউ অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে, আবার কেউ সামাজিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে। অনেকে হয়তো আসেন শুধু নিজের অসহায়ত্বের কথা কাউকে বলতে।

সব সমস্যার সমাধান একজন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিপন্ন কাউকে মন দিয়ে শোনা, সঠিক পরামর্শ দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পথ দেখানোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক সময় সামান্য সহযোগিতাই একজন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন দোকান ও পরিচিত মহলে তাহের ভাইকে ঘিরে মানুষের আন্তরিকতাও চোখে পড়ে। ভালোবাসার টানে কেউ আপ্যায়ন করতে চান, কেউ উপহার দিতে চান, আবার কেউ একটু কথা বলার জন্য এগিয়ে আসেন। বাঙালি সমাজে এই আন্তরিকতার নিজস্ব ভাষা রয়েছে—এক কাপ চা, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় দেওয়া। এসব ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই মানুষের প্রতি মানুষের টান প্রকাশ পায়।

তাহের ভাই সিলেট রত্ন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন, যা তাঁর কর্মকাণ্ডের একটি স্বীকৃতি। তবে আমার বিশ্বাস, মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জনই একজন সমাজকর্মীর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। পুরস্কার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়া যায় কেবল কাজের মধ্য দিয়ে। কারও দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময় একটি সঠিক পরামর্শ দেওয়া কিংবা অসহায় কাউকে সহযোগিতার পথ দেখানো—এসবের মূল্য কোনো পুরস্কারের মাপকাঠিতে পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না।

**তাহের ভাইয়ের দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ডের যথাযথ মূল্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।**

আমার জানা মতে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের উপযুক্ত জাতীয় স্বীকৃতির বিষয়টি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বৃটেনে বাঙালি কমিউনিটির জন্য তাঁর কাজ, প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা, বৃহত্তর সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে তাঁর তৎপরতা এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

এ পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এমবিই (MBE) সম্মানের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আনা যেতে পারে। অবশ্যই, এ ধরনের সম্মাননার নিজস্ব যোগ্যতার মানদণ্ড ও আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নপ্রক্রিয়া রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের জনকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি চাওয়া এবং সেই দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

আমাদের সমাজে একটি প্রবণতা প্রায়ই লক্ষ করা যায়—কারও ভালো কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়েও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে চলে আসে। কে কোন দলের, কোন মতাদর্শের কিংবা কোন পক্ষের—এসব প্রশ্নের ভিড়ে কখনো কখনো তাঁর মানবিক অবদান আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাজনৈতিক বা আদর্শিক মতপার্থক্য থাকলেই কি একজন মানুষের ভালো কাজ অস্বীকার করতে হবে?

তাহের ভাইয়ের সঙ্গে আমার মতের অমিল থাকতে পারে। তাঁর সব বক্তব্য কিংবা সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়াও জরুরি নয়। কিন্তু মানুষের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম ও প্রচেষ্টাকে স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কারণ, প্রশংসা করা মানেই সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতপার্থক্য সত্ত্বেও অন্যের ভালো কাজকে সম্মান জানাতে পারাই উদারতার পরিচয়।

আমার বিশ্বাস, জীবিত মানুষের অবদান তাঁর জীবদ্দশাতেই মূল্যায়ন করা উচিত। একজন মানুষ যখন সমাজের জন্য কাজ করে যান, তখন তাঁর সেই অবদানের স্বীকৃতি তাঁকে যেমন উৎসাহিত করে, তেমনি অন্যদেরও জনকল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করে। যে সমাজ তার নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের চিনতে পারে এবং তাঁদের অবদানের যথাযথ মূল্য দিতে শেখে, সেই সমাজই মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

সময়ের নিয়মে একদিন আমাদের পরিচিত মুখগুলো আড়ালে চলে যাবে। লন্ডনের রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা থাকবে, টেমসের জল বয়ে চলবে আপন গতিতে, বদলে যাবে শহরের দৃশ্যপট। কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কিছু জীবন তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

হয়তো ভবিষ্যতে কেউ স্মরণ করবেন, এই শহরে একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর কাছে সমস্যার কথা বলা যেত। কেউ মনে করবেন তাঁর দেওয়া একটি পরামর্শ, কেউ স্মরণ করবেন প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ, আবার কেউ ফিরে দেখবেন বৃহত্তর সিলেটের জন্য তাঁর সাংগঠনিক প্রচেষ্টার দিনগুলো। এভাবেই একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বৃহত্তর সমাজের স্মৃতি ও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

আমি চাই, কে এম আবু তাহের চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সামাজিক অবদান যথাযথ মূল্যায়ন পাক এবং তাঁর কাজ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করুক। তিনি সুস্থ শরীরে আরও দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থাকুন, নিজের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞান দিয়ে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুন।

প্রবাসজীবনে মানুষ নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। এই বাস্তবতায় যাঁরা অন্যের প্রয়োজনে সময় দেন, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন এবং জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

তাহের ভাই, আপনার সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু মানুষের জন্য আপনার দীর্ঘদিনের কাজ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দেওয়াকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আপনার প্রতি এই শ্রদ্ধা কোনো ব্যক্তিগত মতের সঙ্গে একমত হওয়ার শর্তে আবদ্ধ নয়; বরং আপনার কাজের ইতিবাচক দিকগুলোকে স্বীকার করার আন্তরিক প্রয়াস।

পরিশেষে বলতে চাই, মানুষের জীবনের সার্থকতা কেবল পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং মানুষের মনে আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা তৈরি করাই জীবনের বড় অর্জন। জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও যাঁরা মানুষের দুঃখে সাড়া দেন, তাঁরা প্রবাসের মাটিতেও স্বদেশের মমতা ছড়িয়ে দেন।

*মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য রেখে যাওয়া ভালোবাসা থেকে যায়—নদীর স্রোতের মতো, স্মৃতির মতো, দূরদেশে জ্বলে থাকা ঘরের জানালার আলোর মতো।

লেখক কলামিস্ট : রাজা আহমদ ফয়সাল চৌধুরী সভাপতি ইউকে বাংলা প্রেসক্লাব

অনুরোধ –

রাজা আহমদ ফয়সাল চৌধুরীর এই দাবি কে সমর্থন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কে MBE খেতাব ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন – Arafatnews uk Founder Editor M A Hussain

[hupso]